নব্বই দশকের টেলিভিশন নাটকের অন্যতম জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ শফিক সাদেকী। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ (১৭-১৮ বছর) ধরে তিনি অভিনয়ন জগত থেকে দূরে, প্রবাসী হিসেবে বসবাস করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সম্প্রতি সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশে এসেছেন এই গুণী অভিনেতা। চলতি সপ্তাহেই আবার ফিরে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রে।
ক্যারিয়ারের সোনালী সময়ে কেন তাকে অভিনয় ছাড়তে হয়েছিল এবং দীর্ঘ প্রবাস জীবন নিয়ে তার মনের ভেতর জমে থাকা নানা না-বলা কথা সম্প্রতি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
কেন ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থেকে দেশ ছেড়েছিলেন শফিক সাদেকী?
নব্বইয়ের দশক থেকে অভিনয় শুরু করে প্রায় সাড়ে তিনশত নাটকে কাজ করেছেন শফিক সাদেকী। কিন্তু ক্যারিয়ারের শীর্ষবিন্দুতে থাকা অবস্থায় আকস্মিকভাবেই তাকে বিনোদন অঙ্গন ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। এর পেছনে ছিল তৎকালীন নাট্যাঙ্গনের এক অস্বস্তিকর এবং অপেশাদার পরিবেশ।
শফিক সাদেকীর ভাষ্যমতে, সেই সময়ে নাট্য ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিবেশ দ্রুত বদলাতে শুরু করে এবং পেশাদারিত্ব ম্লান হয়ে যায়। বিশেষ করে তৎকালীন একমাত্র রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘ বিটিভি’ (বাংলাদেশ টেলিভিশন)-তে এক ধরনের অদৃশ্য বিভক্তি ও অলিখিত 'ব্ল্যাক লিস্ট' বা কালো তালিকা সংস্কৃতি চালু হয়।
তিনি জানান, "একে নেওয়া যাবে না, ওকে নেওয়া যাবে না"—এমন একটি অদৃশ্য ও নেতিবাচক নিয়মের কারণে অনেক যোগ্য শিল্পী বিটিভির নাটক বা অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করেন। প্রভাবশালী শিল্পী ও নির্মাতাদের ইশারা-ইঙ্গিত ইন্ডাস্ট্রিতে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছিল, যার প্রভাব পরবর্তী সময়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ওপরও পড়ে। একজন পেশাদার শিল্পীর জন্য এই দমবন্ধ করা ও হতাশাজনক পরিবেশ সহ্য করা কঠিন ছিল। মূলত এই পরিস্থিতির শিকার হয়েই তিনি অভিনয় ছাড়তে এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
প্রবাস জীবন ও শিল্পীসত্তার সংকট
দীর্ঘ সতের-আঠারো বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা প্রসঙ্গে শফিক সাদেকী বলেন, একজন নিবেদিতপ্রাণ অভিনয়শিল্পীর জন্য অভিনয় থেকে দূরে থাকা এক ধরনের মানসিক মৃত্যুর শামিল। দীর্ঘ সময় ধরে সাড়ে তিনশ নাটকে অভিনয় করা এবং অভিনয়ের ধারা বজায় রাখা অত্যন্ত পরিশ্রমের বিষয়। কিন্তু যখন সেই ধারায় প্রবল রাজনৈতিক বা অভ্যন্তরীণ বাধা আসে, তখন শিল্পীসত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমেরিকায় যাপন করা এই দীর্ঘ সময়কে তিনি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। নিজের দেশ, পরিবার এবং ভালোবাসার পেশা ছেড়ে প্রবাসে থাকা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও কষ্টের বলে তিনি মন্তব্য করেন। যদিও বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে হেলথ ডিপার্টমেন্টের অধীনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন এবং দেশেও তাদের পারিবারিক ব্যবসা রয়েছে, তবুও অভিনয়ের প্রতি তার টান সবসময়ই রয়ে গেছে।
অভিনয়ে ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু?
দীর্ঘ বিরতির পর দেশে কি স্থায়ীভাবে ফিরবেন বা অভিনয়ে নিয়মিত হবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে শফিক সাদেকী জানান, দেশের সার্বিক পরিবেশ যদি কাজের জন্য উপযুক্ত এবং সুষ্ঠু হয়, তবে তিনি ফেরার কথা ভাববেন। তবে স্থায়ীভাবে না হলেও, " দেশে আসা, কাজ করা এবং ফিরে যাওয়া"—এমন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি যুক্ত হতে পারেন।
তিনি লক্ষ্য করছেন যে, দেশের বর্তমান নাট্যাঙ্গনের পরিবেশ ধীরে ধীরে একটি ইতিবাচক ও সুষ্ঠু পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। অভিনয় তার রক্তে মিশে আছে এবং এটাই তার মূল ভিত্তি। সতের-আঠারো বছরের দীর্ঘ গ্যাপের কারণে জীবনের অনেক কিছু বদলে গেছে, পেশা পরিবর্তন হয়েছে। আগের মতো পুরোদমে কাজ করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে নিজের যোগ্যতার উপযোগী কোনো কাজের সুযোগ পেলে মনের ভেতরের অভিনয়ের তৃষ্ণা মেটাতে তিনি অবশ্যই ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চান।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি এবং দেশের পারিবারিক ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সময় বের করা তার জন্য কিছুটা কঠিন। তবে এই দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে নিজেকে আবার ইন্ডাস্ট্রিতে থিতু করতে কিছুটা সময় নিচ্ছেন এই অভিনেতা। উপযুক্ত গল্প ও পরিবেশ পেলে দর্শকদের মাঝে আবারও চেনা রূপে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন নব্বই দশকের এই জনপ্রিয় তারকা।
